চীনে জানুয়ারিতে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে। তবে একই সময়ে উৎপাদক পর্যায়ে মূল্যহ্রাস অব্যাহত রয়েছে। সব খাতে ভোক্তা ব্যয় সমন্বিতভাবে বাড়েনি বলেও ইঙ্গিত দিচ্ছে এ পরিস্থিতি। একই সঙ্গে শিল্প খাতে চাহিদা সংকুচিত হয়েছে। সম্প্রতি চীনা জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (এনবিএস) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। খবর রয়টার্স।
বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে চলতি বছরও চীনে পণ্যের দাম কমার প্রবণতা বজায় থাকতে পারে। এছাড়া চীনা পণ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত শুল্ক দেশটির অর্থনীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করবে।
এনবিএসের তথ্যমতে, জানুয়ারিতে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল দশমিক ১ শতাংশ। রয়টার্সের বিশ্লেষকরা ভোক্তা মূল্যসূচক দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থিতিশীল দামের পণ্য বাদ দিলে মূল ভোক্তা মূল্যস্ফীতি জানুয়ারিতে দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল দশমিক ৪ শতাংশ।
গবেষণা সংস্থা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জু তিয়ানচেন বলেন, ‘ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। তবে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে শিল্প খাতে মূল্যস্ফীতি স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক ধারায় ফিরবে না।’
জিডিপি ডিফ্লেটর অর্থনীতির সব খাতের দাম পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করে। জু বলেন, ‘এ সূচকের মাধ্যমে হিসাব করা হলে মূল্য সংকোচন পরিস্থিতি থেকে বের হতে চীনকে আরো কয়েকটি প্রান্তিক অপেক্ষা করতে হবে।’
ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ও মূল্য সংকোচন মৌসুমি নিয়ামকগুলোর কারণে প্রভাবিত হয়েছে। চীনা নববর্ষ গত বছর ফেব্রুয়ারিতে উদযাপন হয়েছিল। এ বছর হয়েছে জানুয়ারিতে। সাধারণত নববর্ষের ছুটি কেন্দ্র করে মানুষ বেশি কেনাকাটা করে। বিশেষ করে পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য খাদ্য মজুদ করে চীনারা। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।
গত মাসে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। পর্যটনসংক্রান্ত খরচ ৭ শতাংশ এবং সিনেমা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের টিকিটের মূল্য ১১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বেতন ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে নববর্ষের ছুটিতে ভোক্তা ব্যয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সিনেমা হলে বেশি যাওয়ার পাশাপাশি কেনাকাটা ও অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে বেশি ব্যয় করেছে চীনা নাগরিকরা। তবে এক্ষেত্রে মাথাপিছু ব্যয় আগের বছরের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
জানুয়ারিতে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা ডিসেম্বরে অপরিবর্তিত ছিল। এ হার দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাসের তুলনায় কম।
২০২৪ সালে সিপিআই দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, যা সরকার নির্ধারিত ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এর মধ্য দিয়ে চীন টানা ১৩ বছর বার্ষিক মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
চীনের উৎপাদন খাত জানুয়ারিতে অপ্রত্যাশিতভাবে সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি সেবা খাতের কার্যক্রমেও স্থবিরতা এসেছে। জানুয়ারিতে উৎপাদক মূল্যসূচক (পিপিআই) বার্ষিক ভিত্তিতে ২ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গেছে, যা ডিসেম্বরেও একই হারে কমেছিল। এ হার ২ দশমিক ২ শতাংশ কমার পূর্বাভাসের তুলনায়ও বেশি। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস ও অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে কারখানা পর্যায়ে মূল্য টানা ২৮ মাস ধরে নিম্নমুখী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন ২০২৫ সালে ৫ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বজায় রাখার চেষ্টা করবে। তবে নতুন মার্কিন শুল্ক নীতির কারণে রফতানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে।